প্রেম ও সম্পর্ক নিয়ে তরুণ প্রজন্মের ভাবনায় আসছে পরিবর্তন। সম্পর্কের শুরুতেই নিজেদের চাওয়া-পাওয়া, প্রত্যাশা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে স্পষ্ট ধারণা পেতে চান জেন–জির অনেকে। অকারণে অপেক্ষা করানো, সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি করা কিংবা ভালোবাসার নামে নিয়ন্ত্রণ করার মতো আচরণকে তারা আর সহজভাবে মেনে নিতে রাজি নন। বরং পারস্পরিক বোঝাপড়া, খোলামেলা আলোচনা ও ব্যক্তিগত স্বাধীনতাকে গুরুত্ব দিচ্ছেন। সম্পর্কবিষয়ক প্রচলিত কিছু অভ্যাস থেকে তরুণদের সরে আসার এই প্রবণতাকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরাও। এমএসএনে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে উঠে এসেছে জেন-জির অপছন্দের এমন পাঁচটি ডেটিং অভ্যাস।
১. ইচ্ছা করে মেসেজের উত্তর দিতে দেরি করা
কাউকে পছন্দ করলেও ইচ্ছাকৃতভাবে মেসেজের উত্তর দিতে দেরি করা, নিজের আগ্রহ গোপন রাখা কিংবা সব সময় অপর পক্ষের উদ্যোগের অপেক্ষায় থাকা-একসময় ডেটিংয়ের পরিচিত কৌশল ছিল এসব। অনেকের ধারণা ছিল, শুরুতেই বেশি আগ্রহ দেখালে নিজেকে অতিরিক্ত আগ্রহী বা সহজলভ্য মনে হতে পারে।
তবে জেন-জির অনেকেই এই ধারণার বাইরে গিয়ে সরাসরি আগ্রহ প্রকাশ করাকে গুরুত্ব দেন। মেসেজ দেখেও ইচ্ছা করে উত্তর না দেওয়া বা অন্যজনকে অপেক্ষায় রাখার বদলে সময়মতো উত্তর দেওয়া এবং যোগাযোগে আন্তরিক থাকাকে তারা ইতিবাচক আচরণ হিসেবে দেখেন। তাদের কাছে সম্পর্কের শুরুতেই কৌশল করে দূরত্ব তৈরি করার চেয়ে স্বাভাবিক ও স্পষ্ট যোগাযোগ বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
২. মাসের পর মাস শুধু কথাবার্তা চালিয়ে যাওয়া
নিয়মিত মেসেজ আদান-প্রদান, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রিল শেয়ার করা কিংবা দীর্ঘ সময় ধরে কথা বলা-সবই চলছে। কিন্তু সম্পর্কটি শেষ পর্যন্ত কোন দিকে এগোবে, তা স্পষ্ট নয়। ডেটিংয়ের এই অনিশ্চিত পর্যায়কে বলা হয় ‘টকিং স্টেজ’।
জেন–জির অনেকেই দীর্ঘদিন এই পর্যায়ে আটকে থাকতে চান না। তাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হলো, দুজনের মধ্যে সম্পর্কের বিষয়ে প্রত্যাশা ও উদ্দেশ্য কতটা পরিষ্কার। তাই অপর পক্ষ কী চান, সম্পর্কটিকে কীভাবে দেখছেন কিংবা ভবিষ্যতে এগিয়ে নেওয়ার আগ্রহ আছে কি না-এসব প্রশ্ন সরাসরি করতেই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন অনেকে।
শুরুতে এমন প্রশ্ন করতে অস্বস্তি হতে পারে। তবে এতে সম্পর্কের অবস্থান সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যায়। ফলে দীর্ঘদিন অনুমানের ওপর নির্ভর করে অপেক্ষা করা কিংবা ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তায় থাকার ঝুঁকি কমে।
৩. ঈর্ষাকে ভালোবাসার প্রমাণ হিসেবে দেখা
প্রেমের সম্পর্কে ঈর্ষা প্রকাশকে একসময় ভালোবাসার লক্ষণ হিসেবে বিবেচনা করতেন অনেকে। সঙ্গী কার সাথে কথা বলছেন, কোথায় যাচ্ছেন কিংবা কার সাথে সময় কাটাচ্ছেন, তা নিয়ে অতিরিক্ত কৌতূহলকেও কখনো কখনো গভীর ভালোবাসার প্রকাশ মনে করা হতো।
কিন্তু জেন-জির অনেকেই এখন এই ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করছেন। তাদের মতে, কাউকে ভালোবাসা আর তার ব্যক্তিগত জীবনের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা এক বিষয় নয়। সঙ্গীর ফোন পরীক্ষা করা, কার সাথে মিশবেন তা নির্ধারণ করে দেওয়া কিংবা নিজের মতো সময় কাটানোর কারণে তাকে অপরাধবোধে ভোগানো-এসব আচরণ সুস্থ সম্পর্কের লক্ষণ নয়।
বরং পারস্পরিক বিশ্বাস, ব্যক্তিগত পরিসরের প্রতি সম্মান এবং স্বাধীনভাবে জীবনযাপনের সুযোগকে বেশি গুরুত্ব দেন তরুণদের অনেকে। তাদের কাছে ভালোবাসার অর্থ নজরদারি বা খবরদারি নয়; বরং একে অন্যকে বিশ্বাস করা এবং ব্যক্তিস্বাধীনতাকে সম্মান জানানো।
৪. ডেটের খরচ পুরুষকেই দিতে হবে-এমন ধারণা
প্রথম ডেটে পুরুষকেই আমন্ত্রণ জানাতে হবে কিংবা পুরো বিল তাকেই পরিশোধ করতে হবে-এমন প্রত্যাশা দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত। তবে জেন-জির অনেকের কাছে ডেটের খরচ কে দেবেন, তা লিঙ্গের ভিত্তিতে নির্ধারণ করার প্রয়োজন নেই।
তাদের দৃষ্টিতে, যে কেউ প্রথম ডেটে যাওয়ার প্রস্তাব দিতে পারেন। একইভাবে খরচ ভাগ করে নেওয়া, একজনের বিল দেওয়া কিংবা নিজেদের সুবিধা অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগও থাকা উচিত। এখানে মূল বিষয় হলো, দুজনের মধ্যে বোঝাপড়া ও স্বাচ্ছন্দ্য।
অর্থাৎ, কে আগে আমন্ত্রণ জানালেন বা কে বিল দিলেন, তার চেয়ে একে অন্যের পছন্দ ও সামর্থ্যের প্রতি সম্মান দেখানোকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন তরুণদের অনেকে।
৫. অনেক দিন একসাথে ছিলেন বলে সম্পর্ক টিকিয়ে রাখা
দীর্ঘদিনের সম্পর্ক, একসাথে কাটানো অসংখ্য স্মৃতি কিংবা পরিবার ও বন্ধুদের প্রত্যাশা-এসব কারণে অনেকে অসুখী সম্পর্কেও থেকে যান। কারও কারও ক্ষেত্রে দীর্ঘদিনের সম্পর্ক বিয়ে পর্যন্ত গড়ানোর সামাজিক প্রত্যাশাও বিচ্ছেদের সিদ্ধান্তকে কঠিন করে তোলে।
তবে জেন-জির অনেকেই মনে করেন, কোনো সম্পর্ক দীর্ঘদিন স্থায়ী হলেই সেটি সুস্থ বা সুখের সম্পর্ক হয়ে ওঠে না। সম্পর্কের মধ্যে সম্মান, বিশ্বাস, মানসিক স্বস্তি ও পারস্পরিক সহযোগিতা না থাকলে শুধু অতীতের স্মৃতি কিংবা একসাথে কাটানো সময়ের কারণে সেটি টিকিয়ে রাখার প্রয়োজন নেই।
অভ্যাস, বিচ্ছেদের ভয় কিংবা অন্যদের প্রত্যাশার চেয়ে নিজেদের ভালো থাকা ও মানসিক স্বাস্থ্যের গুরুত্বকে সামনে রাখছেন তারা। ফলে সম্পর্কটি আর কাজ করছে না বলে মনে হলে শুধু সময় নষ্ট হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় সেখানে আটকে থাকার বদলে নতুন সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।
সব মিলিয়ে, ডেটিং নিয়ে জেন-জির দৃষ্টিভঙ্গিতে স্পষ্টতা, পারস্পরিক সম্মান, বিশ্বাস ও ব্যক্তিস্বাধীনতার গুরুত্ব বাড়ছে। তবে সব তরুণ একইভাবে সম্পর্ককে দেখেন, এমন নয়। ব্যক্তিভেদে পছন্দ ও প্রত্যাশার পার্থক্য থাকলেও সম্পর্কের ক্ষেত্রে অযথা অনিশ্চয়তা ও নিয়ন্ত্রণমূলক আচরণ এড়িয়ে চলার প্রবণতা নতুন প্রজন্মের ডেটিং সংস্কৃতির একটি উল্লেখযোগ্য দিক।


