...|...|...

সারাদেশ

খুলনায় কথায় কথায় অস্ত্রের ব্যবহার, ১০ মাসে ৭১ হত্যাকাণ্ড

মেহেদী হাসান, খুলনা
প্রকাশ: ২৮ অক্টোবর ২০২৬, দুপুর ১:১৪
Shares
খুলনায় কথায় কথায় অস্ত্রের ব্যবহার, ১০ মাসে ৭১ হত্যাকাণ্ড

খুলনা মহানগরীর ঐতিহ্যবাহী শিববাড়ি মোড়। ছবি: সংগৃহীত

খুলনায় একের পর এক গুলি ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় বাড়ছে উদ্বেগ। কখনো আধিপত্য বিস্তার, কখনো চাঁদাবাজি, আবার কখনো পূর্বশত্রুতার জেরে আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহারের অভিযোগ উঠছে। নগরীর বিভিন্ন স্থানে গুলিতে প্রাণহানি ও আহত হওয়ার পাশাপাশি ক্লিনিকে হামলা, ভাঙচুর এবং চাঁদা দাবির ঘটনাও ঘটছে। ধারাবাহিক এসব ঘটনায় নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন নগরবাসী।

খুলনা মহানগর ও জেলা পুলিশের অপরাধ শাখার তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে ২৩ অক্টোবর পর্যন্ত প্রায় ১০ মাসে খুলনায় গুলি, কুপিয়ে বা অন্য উপায়ে ৭১ জনকে হত্যা করা হয়েছে। এসব ঘটনায় মামলা হয়েছে ৬৯টি। অপরাধের ধরন ও সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহে আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যবহার বিশেষভাবে উদ্বেগ তৈরি করেছে।

গত ২২ অক্টোবর নগরীর পূর্ব বানিয়াখামার এলাকায় তাওহিদুল ইসলাম তুষারকে গুলি করে হত্যা করা হয়। একই দিন জিন্নাহপাড়া এলাকায় গুলিতে নিহত হন খুশি আক্তার। এরপর পৃথক তিনটি ঘটনায় গুলিবিদ্ধ হন যুবদল ও ছাত্রদলের সাবেক দুই নেতা এবং বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মী সালমান হাওলাদার। এ ছাড়া টুটপাড়া এলাকায় গুলি করা হয় রূপসা কলেজের প্রভাষক আকাশ কুণ্ডুকে।

খুলনা মহানগর পুলিশের সদর জোনের সহকারী কমিশনার শফিকুল ইসলাম বলেন, আধিপত্য বিস্তারের জেরে তাওহিদুল ইসলাম তুষার ও খুশি আক্তার হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। আর চাঁদা না দেওয়ায় আকাশ কুণ্ডুকে গুলি করা হয়েছে। এসব ঘটনায় জড়িতদের গ্রেফতারে চেষ্টা চলছে।

এদিকে নগরীর বিভিন্ন ক্লিনিকে হামলা, ভাঙচুর ও চাঁদা দাবির অভিযোগও উঠেছে। সন্ধানী ক্লিনিক অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক কমপ্লেক্সে হামলার সময় বাইরে ফাঁকা গুলি ছোড়ার ঘটনা ঘটে। অন্য একটি ক্লিনিকে অস্ত্র নিয়ে প্রবেশ করে কর্মীদের হুমকি দেওয়ার অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।

খুলনা মহানগর পুলিশের উপকমিশনার রেজাউর রহমান বলেন, প্রতিটি অপরাধের ঘটনায় পুলিশ সক্রিয় রয়েছে। গত ১০ মাসে ৬০ জন তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসীকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তবে তাদের কেউ কেউ জামিনে বেরিয়ে আসছেন।

তিনি বলেন, চাঁদাবাজি বা গুলির ঘটনায় ভুক্তভোগীদের অনেকে মামলা করতে চান না কিংবা পুলিশকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করেন না। দ্রুত জামিনে মুক্তির প্রবণতাও অপরাধ নিয়ন্ত্রণে চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।

খুলনা নাগরিক সমাজের সদস্যসচিব অ্যাডভোকেট বাবুল হাওলাদার বলেন, একটির পর একটি গুলি ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনা নগরবাসীর মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা তৈরি করছে। অপরাধীদের গ্রেফতার করাই যথেষ্ট নয়, অপরাধে ব্যবহৃত অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার এবং অপরাধের নেপথ্যে থাকা ব্যক্তিদেরও আইনের আওতায় আনতে হবে। চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে আরও কার্যকর ভূমিকা রাখতে হবে। একইসাথে দ্রুত তদন্ত ও বিচার নিশ্চিত করা জরুরি। সাধারণ মানুষ যেন নির্ভয়ে চলাফেরা ও ব্যবসা-বাণিজ্য করতে পারেন, সে জন্য আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির দৃশ্যমান উন্নতি প্রয়োজন।

সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) খুলনা জেলা সাধারণ সম্পাদক কুদরত-এ-খুদা বলেন, পুলিশের দায়িত্ব পালনে ঘাটতির কারণেই খুলনার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। একসময় খুলনা শান্ত শহর হিসেবে পরিচিত ছিল। অথচ এখন যেভাবে একের পর এক হত্যাকাণ্ড ঘটছে, তা অকল্পনীয়। এ পরিস্থিতি নগরবাসীর মধ্যে উদ্বেগ ও নিরাপত্তাহীনতা তৈরি করেছে।

খুলনা সচেতন নাগরিক কমিটির (সনাক) সহসভাপতি গৌরাঙ্গ নন্দী বলেন, একসময় খুলনা শান্ত শহর হিসেবে পরিচিত ছিল। কিন্তু এখন একের পর এক হত্যাকাণ্ডের ঘটনা উদ্বেগজনক পরিস্থিতি তৈরি করেছে। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরও মাদক কারবার বন্ধ হয়নি। বরং মাদকের বাজারের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিরোধ সহিংসতার অন্যতম কারণ হয়ে উঠেছে।

খুলনা মহানগর পুলিশের (কেএমপি) কমিশনার মোহাম্মদ সাজ্জাদুর রহমান বলেন, সব অপরাধের পেছনে একই কারণ নেই। কোথাও ব্যক্তিগত বিরোধ, কোথাও ছিনতাই, আবার কোথাও মাদক কারবার, চাঁদাবাজি ও অপরাধী গোষ্ঠীগুলোর দ্বন্দ্বের কারণে সহিংসতার ঘটনা ঘটছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

একটার পর একটা গুলি ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় নগরবাসীর মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা বাড়ছে। অপরাধে ব্যবহৃত অস্ত্রের উৎস শনাক্ত, অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার, চাঁদাবাজি বন্ধ এবং হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের দ্রুত গ্রেফতার এখন বড় চ্যালেঞ্জ। অপরাধীদের আইনের আওতায় আনার পাশাপাশি মামলার তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়ায় দৃশ্যমান অগ্রগতি চান নগরবাসী।