শতাধিক ব্যক্তিকে গুম, হত্যা ও নির্যাতনের অভিযোগে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় বিচারাধীন সাবেক সেনা কর্মকর্তা মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল আহসানের বিচারিক কার্যক্রম এখন থেকে কারাগারে রেখেই ভার্চুয়ালি পরিচালিত হবে। নিরাপত্তাজনিত শঙ্কা বিবেচনায় নিয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ রাষ্ট্রপক্ষের এ-সংক্রান্ত আবেদন মঞ্জুর করেছেন। ফলে তাকে কারাগার থেকে ট্রাইব্যুনালে আনা-নেওয়ার পরিবর্তে অডিও-ভিজ্যুয়াল কনফারেন্সের মাধ্যমে বিচারিক কার্যক্রমে অংশ নিতে হবে।
মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) বিচারপতি গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ এ বিষয়ে রাষ্ট্রপক্ষ ও আসামিপক্ষের শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। শুনানি শেষে ট্রাইব্যুনাল প্রসিকিউশনের আবেদন মঞ্জুর করেন।
এর আগে গত ৮ অক্টোবর জিয়াউল আহসানের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন তার আইনজীবী। আইনজীবীর দাবি, একক প্রিজন ভ্যানে করে তাকে কারাগার থেকে ট্রাইব্যুনালে আনা-নেওয়া করা হলে তার প্রাণনাশের আশঙ্কা রয়েছে। এ কারণে যাতায়াতের নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন তোলে আসামিপক্ষ।
অন্যদিকে, প্রসিকিউশন যুক্তি দেয়, অন্য আসামিদের সাথে একই প্রিজন ভ্যানে জিয়াউল আহসানকে আনা-নেওয়া করা হলে তাদের নিরাপত্তাও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। এ পরিস্থিতিতে তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সশরীরে হাজির না করে কারাগারে রেখেই ভার্চুয়ালি বিচারিক কার্যক্রম পরিচালনার আবেদন জানায় রাষ্ট্রপক্ষ।
জিয়াউল আহসানও কারাগার থেকে ট্রাইব্যুনালে যাতায়াতের সময় নিজের জীবননাশের আশঙ্কার কথা তুলে ধরে অন্য আসামিদের সাথে একই প্রিজন ভ্যানে যাতায়াতের আবেদন করেছিলেন। তার আশঙ্কা, যাতায়াতের পথে কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটলে এর দায় তার ওপর চাপানো হতে পারে।
তার আইনজীবী নাজনীন নাহার জানান, গত ১৬ সেপ্টেম্বর থেকে জিয়াউল আহসানকে অন্য আসামিদের থেকে আলাদা গাড়িতে করে কেরানীগঞ্জের কারাগার থেকে ট্রাইব্যুনালে আনা-নেওয়া করা হচ্ছে। বিষয়টিকে গভীর ষড়যন্ত্র হিসেবে উল্লেখ করে অন্য আসামিদের সাথে একই প্রিজন ভ্যানে যাতায়াতের আবেদন জানিয়েছিলেন তিনি।
তবে প্রসিকিউশনের বক্তব্য ছিল, একই গাড়িতে অন্য বন্দিদের সাথে তাকে আনা-নেওয়া করা হলে সংশ্লিষ্ট বন্দিদের নিরাপত্তাও বিঘ্নিত হতে পারে। উভয় পক্ষের বক্তব্য শুনে ট্রাইব্যুনাল কারাগারে রেখেই ভার্চুয়ালি বিচারিক কার্যক্রম পরিচালনার আবেদন মঞ্জুর করেন।
জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষ্যগ্রহণ এখন শেষ পর্যায়ে রয়েছে। প্রসিকিউশনের ভাষ্য অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের গুম-সংক্রান্ত মামলাগুলোর মধ্যে এটিই প্রথম মামলা, যা এ পর্যায়ে পৌঁছেছে। এ পর্যন্ত মামলায় ১৫ জন সাক্ষ্য দিয়েছেন।
মামলার সর্বশেষ সাক্ষী তদন্ত কর্মকর্তা মো. রফিকুল ইসলামের জবানবন্দি বৃহস্পতিবার তৃতীয় দিনের মতো রেকর্ড করা হয়েছে। তার অবশিষ্ট জবানবন্দি আগামী রবিবার রেকর্ড করা হবে। এরপর আসামিপক্ষের আইনজীবীরা তাকে জেরা করবেন বলে জানিয়েছেন প্রসিকিউটর গাজী এম এইচ তামিম।
জবানবন্দিতে তদন্ত কর্মকর্তা অভিযোগ করেন, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের ঘটনা প্রকাশ্যে এলে সেগুলোকে বৈধতা দিতে লোকদেখানো প্রশাসনিক তদন্ত করা হতো। প্রকৃত মৃত্যুর কারণ গোপন রেখে মিথ্যা ও ভুল ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন এবং পুলিশ প্রতিবেদন তৈরির মাধ্যমে প্রকৃত অপরাধীদের আড়াল করার চেষ্টা করা হতো বলেও তিনি দাবি করেন।
রাষ্ট্রপক্ষের দাবি, জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছে তারা। তবে মামলার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেবেন ট্রাইব্যুনাল।
শতাধিক ব্যক্তিকে গুম ও হত্যার অভিযোগে জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে গত বছরের ১৭ ডিসেম্বর আনুষ্ঠানিক অভিযোগপত্র দাখিল করে প্রসিকিউশন। একই দিন ট্রাইব্যুনাল তার বিরুদ্ধে তিনটি অভিযোগ আমলে নেন। পরে ২৩ ডিসেম্বর তাকে গ্রেফতার দেখিয়ে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১।



