মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় জামায়াত নেতা মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে করা মামলার বাদী মুক্তিযোদ্ধা মানিক পশারীর মৃত্যুর প্রায় ১৪ ঘণ্টা পর তার দাফনের প্রস্তুতি শুরু হয়েছে। এরই মধ্যে কবর খোঁড়ার কাজ চলছে। এর আগে দাফন ও রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় গার্ড অব অনার দেওয়া নিয়ে জটিলতা সৃষ্টি হওয়ায় তার মরদেহ পুলিশ লাইন্সে রাখা হয়েছিল।
শনিবার (২৪ অক্টোবর) সকাল ১০টার দিকে গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়া এলাকায় মেয়ের জামাতার বাড়িতে মারা যান মানিক পশারী (৮৭)। দীর্ঘদিন আত্মগোপনে থাকার পর তিনি সেখানে আশ্রয় নিয়েছিলেন। মৃত্যুর পর শনিবার দুপুরে তার মরদেহ পিরোজপুরে আনা হয়।
রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় গার্ড অব অনার দেওয়ার জন্য মরদেহ পিরোজপুর সদর উপজেলা পরিষদ চত্বরে নেওয়া হলে সেখানে স্থানীয় লোকজন জড়ো হন। এ সময় গার্ড অব অনার দেওয়া এবং মরদেহ দাফন নিয়ে বাধার সৃষ্টি হয়। পরে পুলিশের সহায়তায় মরদেহটি পুলিশ লাইন্সে নেওয়া হয়। সেখানে উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে তাকে গার্ড অব অনার দেওয়া হয়।
পরিবারের অভিযোগ, গার্ড অব অনার দেওয়ার পর মরদেহ হস্তান্তর করে দাফনের উদ্যোগ নেওয়া হলেও স্থানীয়দের বাধার আশঙ্কায় তাৎক্ষণিকভাবে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়নি। রাত ১২টা পর্যন্ত মরদেহটি পুলিশ লাইন্সে পুলিশের হেফাজতে রাখা হয়। পরে দিনভর অনিশ্চয়তা ও জটিলতার অবসান ঘটিয়ে দাফনের প্রস্তুতি শুরু হয়।
পরিবার সূত্রে জানা গেছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর মানিক পশারী গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় মেয়ের জামাতার কাছে আশ্রয় নেন। গত দুই মাস ধরে তিনি শারীরিক অসুস্থতায় ভুগছিলেন। তিনি পিরোজপুর সদর উপজেলার শংকরপাশা ইউনিয়নের চিতলিয়া গ্রামের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা।
মানিক পশারীর মেয়ের জামাতা ফারুক হোসেন জানান, শনিবার দুপুর ১২টার দিকে তারা সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কাছে গেলে গার্ড অব অনার দেওয়ার কথা বলে বিকেল ৫টা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে বলা হয়। দীর্ঘ সময় সাধারণ অ্যাম্বুলেন্সে মরদেহ রাখার পর গোপনে গার্ড অব অনার দেওয়া হয় বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
ফারুক হোসেনের ভাষ্য, পরে মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করে দাফনের উদ্যোগ নেওয়া হলেও বাধার আশঙ্কা তৈরি হয়। এ কারণে মরদেহটি পরিবারের কাছে হস্তান্তর না করে পুলিশ লাইন্সে রাখা হয়।
মানিক পশারীর বোন মোছাম্মৎ রিনা আক্তার বলেন, ‘আমার ভাই মারা গেছেন। প্রথমে আমরা তাকে দাফনের জন্য নিয়ে আসি। কিন্তু দাফন করতে না পারায় আমরা বিপাকে পড়ি। এখন দাফনের প্রস্তুতি নিচ্ছি, কবর খুঁড়ছি।’
এদিকে পিরোজপুর জেলা জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি আব্দুর রাজ্জাক বলেন, ‘মানিক পশারী একজন ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা। তিনি পিরোজপুর-১ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর নামে মিথ্যা মামলা দিয়ে তাকে দীর্ঘকাল জেলে আটকে রেখেছিলেন। শেষ পর্যন্ত সেই মামলায় সাঈদী সাহেব জেলেই ইন্তেকাল করেন। আমরা মানিক পশারীর লাশ গার্ড অব অনার প্রদানে আমাদের আপত্তি ছিল। তবে তার দাফনে কোনো বাধা প্রদান করিনি। সাধারণ জনগণ ক্ষুব্ধ হয়ে বাধা দিতে পারে।’
পিরোজপুর সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. শরিফুল ইসলাম বলেন, মানিক পশারীকে গার্ড অব অনার দেওয়া হয়েছে। তবে তখনো তার মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়নি। মরদেহ দাফনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।
সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. ইফতেখারুল ইসলাম শামীম বলেন, রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় মানিক পশারীকে গার্ড অব অনার দেওয়া হয়েছে।তাঁর মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তরের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। তবে স্থানীয়দের বাধার মুখে তা না করে মরদেহ পুলিশি হেফাজতে রাখা হয়।
উল্লেখ্য, ২০০৯ সালের ১২ আগস্ট পিরোজপুর থানায় মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীসহ পাঁচজনের বিরুদ্ধে ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে মামলা করেন মানিক পশারী। পরবর্তী সময়ে মামলাটি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে সাঈদীর বিরুদ্ধে চলা মূল মামলার সাথে যুক্ত করা হয়।


